কোভিড-১৯ মহামারি ছাড়া বর্তমান বিশ্বে যেসব বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে তার একটি ডিমেনশিয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বেশিরভাগ দেশ ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রস্ট হওয়ার ক্রমবর্ধমান সমস্যা মোকাবেলায় ব্যর্থ হচ্ছে।
সংস্থাটির নতুন এক রিপোর্টে বলা হয়েছে- সারা বিশ্বের মাত্র এক চতুর্থাংশ দেশের জাতীয় নীতিমালা রয়েছে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারকে সাহায্য দেওয়ার ব্যাপারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে বর্তমানে সাড়ে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এবং এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে এই সংখ্যা তিনগুন বৃদ্ধি পাবে।
এই রোগটির কথা ১৯০৬ সালে প্রথম উল্লেখ করেন আলোইস আলঝেইমার নামের একজন জার্মান চিকিৎসক। স্মৃতি হারিয়ে ফেলা একজন নারীর ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান যে তার মস্তিষ্ক নাটকীয়ভাবে শুকিয়ে গেছে এবং স্নায়ুকোষগুলো ও তার আশেপাশে অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হয়েছে। সেসময় এটি খুব বিরল রোগ ছিল এবং তার পরেরও কয়েক দশকেও এনিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি।
ডিমেনশিয়া কী:
মস্তিস্কের অনেক অসুখের একটি উপসর্গ এই ডিমেনশিয়া। এর স্বাভাবিক ও সাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়া বা ভুলে যাওয়া। কেউ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হলে তার পক্ষে অতীতের চেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা মনে রাখা অনেক বেশি কঠিন।
বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের নিউরো মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও নিউরোলজিস্ট ড. সেহেলী জাহান বলেন, এটা মূলত বয়স্ক মানুষের রোগ।
"বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্মৃতির ব্যাপারে সমস্যা দেখা দেয়। সহজ করে বললে এটি হচ্ছে ভুলে যাওয়া রোগ। এর সাথে অন্যান্য সমস্যাও হয় যেমন নিজের কাজগুলো নিজে ঠিক মতো করতে না পারা। কারো হাঁটা চলারও সমস্যা হয়," বলেন তিনি।
ডিমেনশিয়ার আরো যেসব উপসর্গ আছে তার মধ্যে রয়েছে আচরণের পরিবর্তন, মেজাজ ও ব্যক্তিত্ব, পরিচিত জায়গাতেও হারিয়ে যাওয়া অথবা কারো সঙ্গে আলাপ করার সময় সঠিক শব্দটি খুঁজে না পাওয়া।
এটা এমন এক পর্যায়ে গিয়েও পৌঁছাতে পারে যে তিনি খেয়েছেন কীনা সেটাও তিনি মনে করতে পারেন না। চাবি কোথায় রেখেছেন, চেকে সই করেছেন কীনা- এসব তারা সহজেই ভুলে যান।
এমনকি তারা কথাও গুছিয়ে বলতে পারেন না। কথা বলার সময় কোন শব্দের পর কোন শব্দ ব্যবহার করবেন কিম্বা একটা বাক্যের পর পরের বাক্যে কী বলবেন সেসব তারা মেলাতে পারেন না।
ড. জাহান বলেন, ডিমেনশিয়ার নানা রকমের প্রকারভেদ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় আলঝেইমার্সজনিত ডিমেনশিয়া যা বংশগত।
আরো কিছু ডিমেনশিয়ার মধ্যে রয়েছে ভাসকুলার ডিমেনশিয়া, লিউই বডি ডিমেনশিয়া, ফ্রন্টো টেম্পোরাল ডিমেনশিয়া এবং পারকিনসন্স জনিত ডিমেনশিয়া।
বাংলাদেশে ডিমেনশিয়া:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, ২০০০ সালের পর থেকে ডিমেনশিয়ার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সারা বিশ্বে বর্তমানে যেসব অসুখের কারণে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তার তালিকায় ডিমেনশিয়ার অবস্থার পাঁচ নম্বরে।
এই রোগে ধনী দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।
ব্রিটেনের দাতব্য প্রতিষ্ঠান আলঝেইমার্স রিসার্চ ইউকে বলছে, "আমাদের সময়ে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ডিমেনশিয়া। এর চিকিৎসায় কিছু করতে না পারলে ডিমেনশিয়াতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।"
কিন্তু বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের নিউরোলজিস্ট ড. সেহেলী জাহান বলেন, বাংলাদেশে এই অসুখটি এখনও পশ্চিমা দেশগুলোর মতো প্রকট নয়।
তিনি বলেন, "আমার হাসপাতালে আমি যত রোগী দেখি তাদের মধ্যে অন্য রোগের তুলনায় ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা খুব কম। তবে এই রোগের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও অনেক কম। একারণে তারা রোগীদের ডাক্তারের কাছে আনে না কীনা সেটা আমি বলতে পারবো না। তবে যারা ডিমেনশিয়ার রোগী তাদের বেশিরভাগই কয়েকবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন," বলেন ড. সেহেলী জাহান।
বিজ্ঞানীরা বলছেন মানুষের মস্তিষ্ক সত্যিকার অর্থেই এক বিস্ময়কর ও জটিল এক কাঠামো। ১০০ বিলিয়নেরও বেশি নিউরন দিয়ে এই মস্তিষ্ক গঠিত।বলা হয়, এই পৃথিবীতে সবার যদি একটি করে কম্পিউটার থাকে এবং সবাই এক সঙ্গে লগ-ইন করে একই সময়ে কাজ করেন, তার পরেও সেই কাজ মস্তিষ্কের দশভাগের একভাগ কাজের সমান হবে না।